ঝুঁকি ও যাচাই
কাগজের দাম আর যে দামে বিক্রি হয়, দুটো এক নয়: RWA টোকেনের তারল্যের ফাঁদ
দুটো সংখ্যা। একটা ইস্যুকারীর ঘোষিত নিট সম্পদমূল্য, আরেকটা আপনি বিক্রির বোতাম চাপলে যে গড় দামে আসলে লেনদেন হয়। বেশির ভাগ সময় দুটো কাছাকাছি থাকে — আর যেদিন আপনার টাকাটা দরকার, সেদিন সাধারণত “বেশির ভাগ সময়” নয়।
ইস্যুকারীর ঘোষণা অনুযায়ী ইউনিটপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ১.০৪৩২ ডলার; ঠিক ওই সময়ে চেইনের ওপরের তারল্য-পুলে চলতি দর দেখাচ্ছে ১.০৪১৮ ডলার। পার্থক্য ০.১৩% — দেখে মনে হয় কোনো সমস্যাই নেই। (সংখ্যাগুলো কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের নয়, ব্যাপারটা দেখানোর জন্য বসানো।)
কিন্তু ওই দরটা সত্যি কেবল “খুব ছোট একটা লেনদেনের” জন্য। পুলের মোট আকার যদি হয় চার লাখ ডলার, আর আপনি বেচতে চান আশি হাজার ডলারের পজিশন — তাহলে আপনার গড় দাম ১.০৪১৮ হবে না; আপনি দামটাকে ধাপে ধাপে নিচে নামিয়ে নিয়ে যাবেন, আর শেষ পর্যন্ত হাতে আসতে পারে ১.০২-এর একটু ওপরে। যে পার্থক্যটা কাগজে ০.১৩% ছিল, বাস্তব লেনদেনে সেটা দাঁড়াল ২%-এর বেশি।
বার্ষিক আয় যদি হয় ৪.৫%, তাহলে এই একবার ঢোকা-বেরোনোই প্রায় ছয় মাসের আয় খেয়ে ফেলল। তারল্যের ফাঁদ বলতে এটুকুই: দর দেখানো হয় এক ইউনিটের জন্য, আর আপনি বেচতে চান পুরো পজিশন।
RWA টোকেনে এই ফাঁদে পড়া কেন বেশি সহজ
কাঠামোগত তিনটি কারণ।
ধারকের সংখ্যা কম, আকার বড়। এ ধরনের পণ্যের ধারকরা সাধারণত সংখ্যায় কম কিন্তু অঙ্কে বড় — মূলধারার ক্রিপ্টো সম্পদের মতো লাখ লাখ ছোট ধারক বাজারে ঢুকছে-বেরোচ্ছে, তেমনটা নয়। গুটিকয় বড় ধারকের নড়াচড়াই দাম ঠিক করে দিতে পারে।
মার্কেট মেকিংয়ে আগ্রহ কম। মার্কেট মেকাররা আয় করে দামের ব্যবধান থেকে; কিন্তু RWA টোকেনের ওঠানামা কম, লেনদেনের পরিমাণও কম, ফলে ব্যবধানের জায়গা সীমিত — অথচ মজুত ধরে রাখার ঝুঁকি তাদের নিতেই হয়। আগ্রহ না থাকলে অর্ডার বই পাতলাই থাকে।
হোয়াইটলিস্ট ক্রেতার সংখ্যা ছেঁটে দেয়। টোকেন যদি কেবল যাচাই-করা ঠিকানার মধ্যেই হাতবদল করতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা এমনিতেই অনেকটা কমে যায়। এটা কমপ্লায়েন্সের প্রয়োজনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া — এড়ানোর উপায় নেই।
কেনার আগে মাপবেন কীভাবে
পেশাদার কোনো টুল লাগে না, দুটো কাজ করলেই যথেষ্ট।
যদি এটা মূলত চেইনের ওপরের পুলে লেনদেন হয়
সংশ্লিষ্ট বিকেন্দ্রীভূত এক্সচেঞ্জের পাতায় গিয়ে আপনি যত ইউনিট ধরে রাখতে চান তার পুরোটা বসিয়ে দিন, আর দেখুন আনুমানিক কত পাবেন এবং দামের ওপর কতটা প্রভাব পড়ছে। বেশির ভাগ পাতাই স্লিপেজের শতাংশ সরাসরি হিসাব করে দেখায়।
খেয়াল রাখবেন — দিকটা হতে হবে বিক্রি, আর অঙ্কটা হতে হবে পুরো পরিমাণ, একটা ইউনিট বসিয়ে দেখা নয়। অনেকে “১ ইউনিটে ১.০৪ পাচ্ছি” দেখেই ধরে নেন সব ঠিক আছে।
সঙ্গে পুলের মোট আটকে থাকা অঙ্কটাও দেখে নিন। মোটা দাগের অভিজ্ঞতা হলো: আপনার পজিশন পুলের আকারের শতকরা কয়েক ভাগ ছাড়ালেই স্লিপেজ চোখে পড়ার মতো হয়ে যায়। সঠিক অনুপাত নির্ভর করে পুলের বক্ররেখার নকশার ওপর — তবে নিজের সংখ্যা বসিয়ে একবার হিসাব করে নেওয়া যেকোনো অভিজ্ঞতার সূত্রের চেয়ে নির্ভুল।
যদি এটা মূলত এক্সচেঞ্জের অর্ডার বইয়ে লেনদেন হয়
ডেপথ চার্ট বা অর্ডার বই খুলুন, সবচেয়ে ভালো ক্রয়দর থেকে নিচের দিকে ক্রয়-অর্ডারের পরিমাণ যোগ করতে থাকুন — যতক্ষণ না আপনার পজিশনের সমান হয় — আর দেখুন দামটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এটাই “এখনই পুরোটা বেচে দিলে” আপনার গড় দাম।
অর্ডার বইয়ে কাছের ধাপগুলোই দেখবেন। কিছু বাজারে অনেক দূরে বিশাল অঙ্কের অর্ডার বসানো থাকে; ওগুলো আপনার কাজে আসে না — দাম ওই পর্যন্ত নামতে নামতে আপনার ক্ষতি তো হয়েই গেছে।
এর সঙ্গে আরেকটা জিনিস দেখতে হবে: বসানো অর্ডার ছেড়ে সম্পন্ন লেনদেনের দিকে তাকান। বসানো অর্ডার যেকোনো মুহূর্তে তুলে নেওয়া যায়, কিন্তু সম্পন্ন লেনদেনের রেকর্ড মুছে যায় না। গত কয়েক দিনে কতগুলো লেনদেন হয়েছে আর কত টাকার হয়েছে — এটা দেখা এই মুহূর্তের অর্ডার বই দেখার চেয়ে অনেক সৎ। যে বাজারে অর্ডার বই দেখতে পুরু কিন্তু সারা দিনে হাতে গোনা কয়েকটা লেনদেন হয়, সেখানে আপনি সত্যিই বেচতে গেলে ওই অর্ডারগুলো বেশির ভাগ সময় উবে যায়।
স্লিপেজকে বার্ষিক হারে বদলে নিলে তবেই বোঝা যায় কতটা লাগল
শুধু “স্লিপেজ ২%” শুনে কিছু অনুভব হয় না; সময়ের সঙ্গে বসালে হয়।
ধরুন আপনি ছয় মাস ধরে রাখবেন, বার্ষিক হার ৪.৫% — অর্থাৎ ছয় মাসে আয় প্রায় ২.২৫%। ঢোকা আর বেরোনোয় যদি ১% করে স্লিপেজ লাগে, যাওয়া-আসায় মোট ২% — মানে আয়ের প্রায় পুরোটাই খেয়ে ফেলল। একই পজিশন যদি তিন বছর রাখেন, ওই একবারের ২% খরচ ভাগ হয়ে বছরে দাঁড়ায় মাত্র ০.৬৭%, প্রভাব অনেক কম।
অর্থাৎ তারল্যের খরচ আর কত দিন ধরে রাখবেন — এই দুটো একসঙ্গে বাঁধা। এ কারণেই “কত দিন রাখব” প্রশ্নটার উত্তর “বছরে কত পাব” প্রশ্নটার আগে দিতে হয়। নিট আয় ক্যালকুলেটরে একটা ঘর আছে ঠিক এই কাজের জন্যই: আনুমানিক স্লিপেজ বসিয়ে দেখুন, আপনার প্রকৃত বার্ষিক হারে সেটা কতটা কামড় বসায়।
দরের চেয়ে আগে নড়ে ওঠে যে তিনটি সংকেত
অর্ডার বই এই মুহূর্তের অবস্থা; ভবিষ্যতে সেটা খারাপ হবে কি না তা বলে না। কয়েকটা জিনিস আগে নড়ে:
ধারকদের কেন্দ্রীভবন। ব্লক এক্সপ্লোরারে টোকেনের ধারক-বণ্টন দেখা যায়। প্রথম দশটি ঠিকানার হাতেই যদি নব্বই শতাংশের বেশি থাকে, তাহলে এই বাজারের গভীরতা কার্যত ওই কয়েকটি ঠিকানার মেজাজের ওপর নির্ভর করে। সংখ্যাটা খুব ধীরে বদলায়, কিন্তু এটাই বাজারটার গঠন ঠিক করে দেয়।
মার্কেট মেকারদের নড়াচড়া। অর্ডার বই যদি দীর্ঘদিন ধরে এক-দুটো উৎসের দরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আর কোনো এক দিন তাদের অর্ডারের পরিমাণ স্পষ্টভাবে ছোট হয়ে যায় — সেটা সাধারণত কাকতালীয় নয়। যারা নিয়মিত বাজার দেখেন, তাদের চোখে এই বদলটা ধরা পড়ে।
সাবস্ক্রিপশন ও রিডেম্পশনের পথের অবস্থা। আগেই বলেছি, আর্বিট্রাজ দাঁড়িয়ে আছে রিডেম্পশনের পথের ওপর। রিডেম্পশনে দেরি, স্থগিতাদেশ বা শর্ত সংশোধন — এ সংক্রান্ত যেকোনো ঘোষণাকে তারল্যের সতর্কসংকেত হিসেবেই দেখা উচিত, তখনো দাম না নড়লেও।
চাপের সময় অবস্থা আরও খারাপ হয় — আর তা দ্বিগুণ হারে
ওপরের হিসাবগুলো সবই স্বাভাবিক সময়ের। বাজারে টান পড়লে দুটো ঘটনা একসঙ্গে ঘটে:
ক্রেতারা উবে যায় — বেচতে চাওয়া মানুষ বাড়ে, কিনতে চাওয়া মানুষ কমে, অর্ডার বই আরও পাতলা হয়ে যায়।
আর ঠিক তখনই রিডেম্পশনের পথও বন্ধ হয়ে যেতে পারে — তখন আর্বিট্রাজকারীরা নিট সম্পদমূল্যে টোকেন ফেরত দিতে পারে না, আর দামের ব্যবধানকে টেনে ঠিক জায়গায় ফেরানোর কেউ থাকে না। এই ব্যবস্থাটার কথাই বলা আছে রিডেম্পশনের শর্ত নিয়ে লেখাটিতে।
দুটো ঘটনা একসঙ্গে চাপলে ছাড় অনেকটা চওড়া হয়ে যেতে পারে। কম তারল্যের সম্পদে বাজারের প্রতিটি চাপের সময়েই এই ধরনটা দেখা গেছে।
তারল্যের অভাবে দরকারের সময় যুক্তিসংগত দামে বেরোনো না-ও যেতে পারে, আর তাতে বাস্তব ক্ষতি হতে পারে। টোকেনাইজড পণ্য মূলধনের নিশ্চয়তা দেয় না; চরম পরিস্থিতিতে পুরো মূলধনই হারাতে পারেন। এই লেখায় দেওয়া হয়েছে মূল্যায়নের পদ্ধতি — নির্দিষ্ট কোনো পণ্য সম্পর্কে রায় নয়, বিনিয়োগ পরামর্শও নয়।
দুটো বাস্তব অভ্যাস
কেনার আগে বিক্রিটা মেপে নিন। যত ইউনিট কিনবেন ভাবছেন, সেটা বসিয়ে বিক্রির দিকের স্লিপেজ দেখুন। কাজটায় ত্রিশ সেকেন্ড লাগে, কিন্তু “এই জিনিসটা আমার জন্য ঠিক আছে কি না” — সেই বিচারটাই এটা বদলে দিতে পারে।
পজিশনের আকার ঠিক করুন তারল্য দেখে, বার্ষিক হার দেখে নয়। বেশি বার্ষিক হার কিন্তু পাতলা অর্ডার বই — এমন জিনিসে কম বার্ষিক হার কিন্তু পুরু অর্ডার বইয়ের চেয়ে কম রাখা উচিত। শুনতে স্বজ্ঞার উল্টো, কিন্তু কথাটা ঠিক। বার্ষিক হার হলো স্বাভাবিক অবস্থায় আপনি যা পাবেন; আর তারল্য ঠিক করে দেয় অস্বাভাবিক অবস্থায় আপনি কতটা হারাবেন।
আমি নিজে একটা রেখা টেনে রাখি: পুরোটা বেচে দিলে স্লিপেজ যদি এক বছরের প্রত্যাশিত আয়ের এক-চতুর্থাংশ ছাড়িয়ে যায়, তাহলে পজিশন কেটে ওই রেখার নিচে নামিয়ে আনি। এই সীমার পেছনে তাত্ত্বিক কোনো ভিত্তি নেই — এটা নিছকই আমি যতটা সইতে পারি; আপনি নিজেরটা ঠিক করে নিতে পারেন। আসল কথা সীমার সংখ্যাটা নয়, আসল কথা হলো আপনার সত্যিই একটা রেখা আছে।